বুধবার ২০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে

চোরাকারবারিরা সক্রিয়, খামারিরা চাপে

জাতীয় ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   4 বার পঠিত

চোরাকারবারিরা সক্রিয়, খামারিরা চাপে

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে খামারে খামারে চলছে শেষ সময়ের প্রস্তুতি। সরকারি হিসাবে, এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশুর সংখ্যা চাহিদার চেয়ে প্রায় ২২ লাখ বেশি। তবু স্বস্তিতে নেই দেশীয় খামারিরা। তাদের শঙ্কা, সীমান্ত দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে গরু ঢুকতে শুরু করলে পশুর বাজারে দামে ধস নামতে পারে। এতে সারা বছর লালন-পালন করা পশু বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারবেন না অনেক খামারি।

গোখাদ্যের লাগামহীন দাম, বিদ্যুৎ ব্যয়, ওষুধ ও পরিচর্যার বাড়তি খরচের মধ্যেও কোনো রকমে টিকে থাকা খামারিদের অভিযোগ, প্রতি বছরের মতো এবারও সীমান্তজুড়ে সক্রিয় চোরাকারবারি চক্র। গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় ও মিয়ানমারের গরু আনতে গিয়ে একাধিক চালান জব্দ করেছে বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে খামারিদের দাবি, জব্দ হওয়া চালান বাস্তব পরিস্থিতির খুব সামান্য অংশ।

এদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেছেন, কোনোভাবেই অবৈধভাবে সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে বিজিবির সঙ্গে বৈঠক এবং সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ঈদুল আজহা হবে আগামী ২৮ মে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন খামারে আগেভাগেই জমে উঠেছে বেচাকেনা। ক্রেতাদের অনেকে পছন্দের পশু অগ্রিম বুকিংও দিচ্ছেন।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের খামারি আবদুল আউয়াল বলেন, গত ঈদে যে গরু চার লাখ টাকায় বিক্রি করা গেছে, সেটি এবার কিনতেই ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। এখন যদি শেষ সময়ে ভারতীয় গরু ঢোকে, তাহলে বাজার ভেঙে যাবে। দেশি খামারিরা বড় লোকসানে পড়বেন।

সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী হাওরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল। অতিবৃষ্টিতে ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা এবার শুধু ফসলই হারাননি, পানির নিচে পচে গেছে খড়ও। ফলে গোখাদ্য সংকটে গরু পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকে আগেভাগে গরু বিক্রি করছেন। তবে কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। স্থানীয় খামারির অভিযোগ, সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা মহিষখলা বাজার এবং দোয়ারাবাজারের বোগলা বাজারে এখনও প্রকাশ্যে ভারতীয় গরু বেচাকেনা হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের বংশীকুন্ডা গ্রামের খামারি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিন ভারতীয় গরু আসছে। আমার ১০টা গরু আছে। তবে এসব গরুর কারণে দেশি গরু বিক্রি নিয়ে চিন্তায় আছি।’

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের বোগলা সীমান্ত নিয়ে স্থানীয়দের ভাষ্য আরও উদ্বেগজনক। অভিযোগ রয়েছে, সন্ধ্যার পর থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে চোরাকারবারি চক্র। ভারতীয় গরু প্রথমে স্থানীয় কয়েকটি খামারে রাখা হয়। পরে সেগুলোকে দেশি গরু হিসেবে বাজারজাত করা হয়। সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট সীমান্ত দিয়েও গরু ঢোকার অভিযোগ রয়েছে।

সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ড. আবু জাফর মো. ফেরদৌস বলেন, স্থানীয় পশু দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব। ভারতীয় গরু এলে খামারিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন না।

ময়মনসিংহ সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাটের খামারি কামরুল হাসান বলেন, গোখাদ্যের দাম বাড়ায় এমনিতেই লোকসানে আছি। তার ওপর ভারতীয় গরু এলে দেশি গরুর দাম অর্ধেকে নেমে আসবে।

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলেও একই শঙ্কা। সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে গরু ঢুকছে বলে অভিযোগ করেছেন খামারিরা। অনেকে বলছেন, ভারতীয় গরুর কারণে তাদের গরু কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রশিদ খামারের মালিক আশরাফুল আলম রশিদ বলেন, তাপদাহে পাঁচটি বাছুর মারা গেছে। বিদ্যুৎ বিল, খাবার, টিকার খরচ বেড়েছে। এর মধ্যে বাইরে থেকে গরু এলে খামারিরা টিকতে পারবে না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তেও ভারতীয় গরুর চোরাচালান বাড়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। শুধু ভারত নয়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকেও অবৈধভাবে গরু-মহিষ ঢুকছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, চাকঢালা, ফুলতলীসহ বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে রাতের আঁধারে গরু-মহিষ আনা হচ্ছে। পরে স্থানীয় খামারে রেখে শরীরের চিহ্ন মুছে দেশি পশু হিসেবে বাজারে তোলা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর করিম বলেন, কম দামে পাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী ঝুঁকি নিয়েও এসব পশু কিনছেন। খামারিদের অভিযোগ, এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। কারণ, যথাযথ কোয়ারেন্টিন বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই এসব পশু বাজারে ঢুকছে।

অবৈধ গরু প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি বিভিন্ন সীমান্তে অভিযান জোরদার করেছে। গত এক মাসে নীলফামারী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জ সীমান্তে একাধিক ভারতীয় গরুর চালান জব্দ করা হয়েছে।
৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাতের আঁধারে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গরু আসার চেষ্টা হয়। আমরা সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছি।

সুনামগঞ্জ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকারিয়া কাদির বলেন, জিরোলাইনের দুই কিলোমিটারের মধ্যে গরুর হাট রয়েছে। এগুলো সরাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বহুবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, সরকার একদিকে দেশীয় খামার সম্প্রসারণে উৎসাহ দিচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তে চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করতে পারছে না। ফলে ক্ষতির মুখে পড়েন দেশীয় খামারিরা। চাহিদার চেয়ে বেশি পশু উৎপাদন হওয়ার পরও যদি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গরু ঢোকে, তাহলে দেশীয় খামারিরা টিকে থাকতে পারবেন না।

Facebook Comments Box

Posted ৭:৩৭ পিএম | মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

(317 বার পঠিত)
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে

NSM Moyeenul Hasan Sajal

Editor & Publisher
Phone: +1(347)6598410
Email: protidinkar@gmail.com, editor@protidinkar.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।